চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ২৫০ কনটেইনার গায়েব

দেশ এডিশন অনলাইন ডেস্ক:
প্রকাশ: ২০ minutes ago

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রহস্যজনকভাবে ২৫০টি পণ্যভর্তি কনটেইনার গায়েব হয়ে গেছে। চোরাচালান ও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অতীতে এসব কনটেইনার খালাসের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। এমনকি কাস্টমসের আন্তর্জাতিক ডিজিটাল নেটওয়ার্ক ‘এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমেও’ (Asycuda World System) এগুলোর ডেলিভারি স্ট্যাটাস লক করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ইয়ার্ডে কনটেইনারগুলোর কোনো হদিস মিলছে না।

সংশ্লিষ্টদের ধারণা, একটি বড় শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র এসাইকোডা সিস্টেমের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে এবং বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভেঙে এই বিপুল সংখ্যক কনটেইনার বন্দর থেকে বাইরে বের করে নিয়ে গেছে। এই আশঙ্কার ভিত্তিতে কনটেইনারগুলোর বর্তমান অবস্থান ও হদিস চেয়ে গত ৭ মাসে পাঁচ দফায় লিখিত চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত একটি চিঠিরও উত্তর দেয়নি। ফলে উধাও হয়ে যাওয়া এসব কনটেইনারে মূলত কী মারাত্মক বা অবৈধ পণ্য দেশে এসেছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই কাস্টমসের, যা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ ও সুদূরপ্রসারী হুমকি হিসেবে দেখছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

কাস্টমস সূত্র জানায়, ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন মিথ্যা ঘোষণায় আমদানি করা পাঁচ শতাধিক কনটেইনার খালাসের ওপর কাস্টমসের নিষেধাজ্ঞা ছিল। এর মধ্যে কিছু নিলাম হয়েছে এবং কিছু আমদানিকারক খালাস করেছেন। তবে বাকি ২৫০টি কনটেইনারের পক্ষে কেউ কোনো ‘বিল অব এন্ট্রি’ দাখিল করেনি।

কাগজ-কলমে থাকা এই কনটেইনারগুলোর রহস্য উদঘাটিত হয় ২০২৫ সালে, যখন শুল্কফাঁকি দিয়ে আনা দুটি কাপড়ের কনটেইনার নিলামে তোলে কাস্টম হাউস। ‘শাহ আমানত ট্রেডিং’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে টাকা পরিশোধ করে কাস্টমসের অনুমতি নিয়ে ইয়ার্ডে পণ্য খালাস করতে গিয়ে দেখে—সেখানে কনটেইনার দুটির কোনো অস্তিত্বই নেই। এতেই শুরু হয় তীব্র তোলপাড়। এরপর কাস্টম হাউস যখন খাতা-কলমের সাথে বাস্তবতার মেলানো শুরু করে, তখনই ২৫০টি কনটেইনার উধাও হওয়ার চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে আসে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসাইকোডা সিস্টেমে লক থাকা অবস্থায় গায়েব হওয়া কনটেইনারগুলোর মধ্যে ২০২১ সালের রয়েছে ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের রয়েছে ৬৬টি কনটেইনার।

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ডেপুটি কাস্টম কমিশনার তারেক মাহমুদ জানান, “কনটেইনারগুলোতে ঘোষণা-বহির্ভূত চোরাই পণ্য আছে—এমন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাহাজ থেকে নামানোর (আইজিএম পড়ার) সাথে সাথেই এগুলোর খালাস লক করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তীতে যখন কেউ পণ্য খালাসের উদ্যোগ নেয়নি, তখন আমরা কায়িক পরীক্ষার জন্য ইয়ার্ডে গিয়ে সেগুলোর কোনো অস্তিত্ব পাইনি। যেহেতু বন্দরের ভেতরে পণ্য ও কনটেইনার রক্ষণাবেক্ষণের সব আইনি দায়িত্ব বন্দর কর্তৃপক্ষের, তাই তাদের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে ৫ বার চিঠি দেওয়া হলেও দুঃখজনকভাবে তারা কোনো জবাব দেয়নি।”

বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য মেরিন কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য না করে বন্দরের সচিবের সাথে কথা বলতে বলেন। তবে বন্দরের সচিবও এ বিষয়ে সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

অবশ্য চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম মনিরুজ্জামান সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে পরোক্ষভাবে স্বীকার করে বলেছিলেন, “বন্দরে একটি বড় সিন্ডিকেট চক্র বিভিন্ন ডকুমেন্ট ও ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে পণ্য খালাস করার অপচেষ্টা করছে। চক্রটিকে সম্পূর্ণভাবে চিহ্নিত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।”

উধাও হওয়া কনটেইনারগুলো দেশের নিরাপত্তার জন্য কেন মারাত্মক, তা উল্লেখ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর এমদাদ (অব.) বলেন, “অতীতে এই চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করেই ২০০৪ সালের ২ এপ্রিল ১০ ট্রাক অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্রের ঐতিহাসিক চালান খালাসের চেষ্টা হয়েছিল। এছাড়া ২০১৫ সালে ৩৭০ লিটার তরল কোকেনের চালান (যার মূল্য ছিল ৯০০ কোটি টাকা), ২০২১ সালে ৪২ টন নিষিদ্ধ পপি সিড এবং ২০২২ সালে বিপুল পরিমাণ মদের চালান কাস্টমসের তৎপরতায় এই বন্দরেই আটক হয়েছিল। এই বাস্তবতায়, একটি কনটেইনারেও যদি দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো অস্ত্র, বিস্ফোরক বা ক্ষতিকর তেজস্ক্রিয় পদার্থ এসে থাকে এবং তা যদি বন্দর থেকে গায়েব হয়ে যায়, তবে তা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”

বন্দর বিশেষজ্ঞ ও চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা ও প্রশাসন) জাফর আলম এই ঘটনায় উভয় পক্ষের গাফিলতি দেখছেন। তিনি বলেন, “কাস্টমস কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা বা স্বাক্ষর ছাড়া বন্দর থেকে কোনো কনটেইনার বের হওয়া প্রায় অসম্ভব। অনেক সময় কনটেইনার বন্দর থেকে চোরাচালান হয়ে বের হয়ে যাওয়ার পর এসাইকোডা সিস্টেমে ‘লক’ করারও নজির আছে। এক কথায়, বন্দর থেকে কনটেইনার গায়েব হওয়া যেমন বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনি কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে। এখানে বন্দর ও কাস্টমস উভয় পক্ষকেই সমানভাবে দায় নিতে হবে।”

error: Content is protected !!