দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের সাথে খাপ খাইয়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, পানির কার্যকর ব্যবহার এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নেওয়া একটি সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ আশানুরূপ অগ্রগতি অর্জনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। পাঁচ বছর আগে অনুমোদিত ‘ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (সিএসএডব্লিউএম)’ নামের এই প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থায়নের দায়িত্ব উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের হলেও, নানামুখী প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় এর বাস্তবায়ন ধীরগতির মুখে পড়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক খসড়া সমীক্ষা প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও অডিট পরিস্থিতি: আইএমইডি সূত্রে জানা গেছে, ১ হাজার ১৮২ কোটি টাকার এই প্রকল্পটির মূল মেয়াদ চলতি মাসেই (৩০ জুন) শেষ হতে চললেও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ২৮.৫৬ শতাংশ এবং এখন পর্যন্ত মোট ব্যয় হয়েছে ২০৩ কোটি টাকা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ অংশ ৮৫০ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পের সেবা ক্রয়ের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘প্যাকেজ-১’ (কনসালটেন্সি সার্ভিস ফর ডিজাইন অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন)-এর দরপত্র আহ্বান ও পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়াকরণেই প্রায় ২ বছর ৫ মাস সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে।
পরামর্শক নিয়োগে এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রকল্পের শুরুতে অন্য কোনো প্যাকেজের দরপত্র আহ্বান করা সম্ভব হয়নি। যার ফলে অধিকাংশ মাঠপর্যায়ের কাজের দরপত্র ২০২৪ ও ২০২৫ সালের দিকে আহ্বান করতে হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পটিতে ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক টেকনিক্যাল কারণে মোট ১৪টি অডিট আপত্তি উঠেছে, যা বর্তমানে নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
আইএমইডির সুপারিশ ও পর্যবেক্ষণ: আইএমইডির খসড়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ২০২২ সালের মার্চে চুক্তি হওয়ার কথা থাকলেও ক্রয় বিশেষজ্ঞ বা প্রকিউরমেন্ট এক্সপার্ট নিয়োগ দেওয়া হয় ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অর্থাৎ, গুরুত্বপূর্ণ বিশেষজ্ঞ নিয়োগের আগেই প্রকল্পের প্রথম এক বছর সময় পার হয়ে যায়। এই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে যেকোনো বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অনুমোদনের প্রথম ৯০ দিনের মধ্যে প্রকিউরমেন্ট এক্সপার্ট নিয়োগ এবং সমান্তরাল কার্যপদ্ধতি নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। যদিও বিশ্বব্যাংকের সাথে মূল ঋণচুক্তি ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে, তবে বর্তমান ধীরগতির কারণে অর্থছাড় রেশিও কিছুটা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য: এই জটিলতার বিষয়ে বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, উন্নয়ন সহযোগীদের ঢালাওভাবে দোষারোপ করার আগে ভেতরের টেকনিক্যাল প্রক্রিয়াটি খতিয়ে দেখা দরকার। তিনি মনে করেন, সম্ভবত বিশ্বব্যাংকের নির্দিষ্ট প্রকিউরমেন্ট গাইডলাইন বা আন্তর্জাতিক ক্রয় নীতিমালার সাথে মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য তৈরিতে কিছুটা বাড়তি সময় লেগেছে। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বব্যাংক প্রতিটি প্রকল্পের কান্ট্রি ডিরেক্টর ও টাস্ক টিম লিডার পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং ও দ্বিমুখী জবাবদিহি নিশ্চিত করে। তাই ঠিক কোন কারণে প্রশাসনিক যোগাযোগে এত সময় লেগেছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের পটভূমি ও বর্তমান অবস্থা: পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) এবং মৎস্য অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রকল্পটি দেশের ৮টি বিভাগের ১৭টি জেলার ২৮টি উপজেলায় বাস্তবায়ন করছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং আধুনিকীকরণ করা।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পণ্য ও কার্যের বেশ কিছু প্যাকেজের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং কাজ চলমান রয়েছে। তবে প্রকল্প এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত জটিলতা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংলগ্ন এলাকায় জমির বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটি ও জায়গার স্বল্পতার কারণে মাঠপর্যায়ে অবকাঠামো নির্মাণকাজ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে। আইএমইডি আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এই সামগ্রিক সমীক্ষা প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত করবে বলে জানা গেছে।