
চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতি তদারকি করতে সরাসরি মাঠপর্যায়ে অবস্থান নিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। কার্যালয়ে বসে গাইডলাইন দেওয়ার প্রথা ভেঙে তিনি গত শুক্রবার (১০ জুলাই) সাতকানিয়া উপজেলার ঢেমশা ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার নিচু অঞ্চলগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে সরাসরি কথা বলে তাঁদের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে ৮০০টি পরিবারের মাঝে বিশেষ প্রটোকলে জরুরি শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও প্রাত্যহিক চিকিৎসাসামগ্রী বিতরণ করেন। প্রতিটি প্যাকেটে এক কেজি করে মুড়ি, চিঁড়া ও চিনি, দুটি বিস্কুটের প্যাকেট, দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি, মোমবাতি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধপত্র দেওয়া হয়। এ সময় চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শরীফ উদ্দিন, সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মাহমুদুল হাসান এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামছুজ্জামানসহ জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময়কালে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেন। তিনি জানান, চট্টগ্রামের কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় সাধারণ নৌকার মাধ্যমে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না। তাই জেলা প্রশাসনের বিশেষ অনুরোধে আজ শনিবার (১১ জুলাই) সকাল থেকেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজস্ব স্পিডবোট নিয়ে মাঠপর্যায়ে উদ্ধার অভিযানে নামছে। কোন উপজেলায় কতটি স্পিডবোট প্রয়োজন এবং কোন এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সে বিষয়ে ইতিমধ্যেই সেনাবাহিনীকে লিখিত রূপরেখা প্রদান করা হয়েছে।
প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের ১৬টি উপজেলা ও মহানগরের ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সাময়িক জলমগ্নতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৮৮ thousand ৬৪৮টি পরিবার বিশেষ পরিস্থিতির মুখোমুখি এবং সার্বিক নাগরিক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৪ হাজার ৫৯০ জন। প্রাকৃতিক কারণে এ পর্যন্ত ১০ জন নাগরিকের জীবনাবসান ঘটেছে এবং আহত হয়েছেন ৫ জন। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেলায় ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্র সম্পূর্ণ প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যেখানে ২৩ হাজার ৮৫০ জন নাগরিক আশ্রয় নিয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবারের পাশাপাশি তিন বেলা রান্না করা খাবারের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরকারি বিশেষ বরাদ্দ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক জানান, এ পর্যন্ত ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৬০ লাখ টাকা সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৩ লাখ টাকা এবং হাজার হাজার প্যাকেট শুকনো ও রান্না করা খাবার বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে বর্তমানে আরও ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ১৭ লাখ টাকা জরুরি ত্রাণ হিসেবে সম্পূর্ণ মজুত রয়েছে। শুধুমাত্র সাতকানিয়া উপজেলার জন্যই ৯ লাখ টাকা ও ২৫ মেট্রিক টন চাল দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে চলমান এই সমন্বিত কার্যক্রমে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ কোস্টগার্ড (সন্দ্বীপে), পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকেরা একযোগে কাজ করছেন।
প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের পর সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার পুনর্গঠনের একটি প্রাথমিক খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন ২০টি সড়কের ৫০ দশমিক ৫৬ কিলোমিটার অংশ সংস্কারের তালিকায় এসেছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৫১৪টি সড়কের ২৪৭ দশমিক ৬৫ কিলোমিটার অংশ এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
শনিবার সকাল থেকে সাংগু নদীর পানি সমতল স্পর্শ করায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে সমন্বয় করে স্লুইস গেট ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সার্বক্ষণিকভাবে সচল রাখতে কারিগরি দল কাজ করছে। জলাবদ্ধতার কারণ প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, “শুধুমাত্র নদী বা খাল দখল নয়, নাগরিকদের অসচেতনতার কারণে খালে বিভিন্ন ধরনের ভারী বর্জ্য ও প্লাস্টিক ফেলার কারণেও পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে। খাল পরিষ্কার করতে গিয়ে ফ্রিজ, জাজিমসহ নানা বর্জ্য পাওয়া গেছে।” তিনি খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে আইনগত ব্যবস্থার পাশাপাশি নাগরিকদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে বৃষ্টিপাত কমলে পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে। জেলা প্রশাসক সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই মানবিক পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন।