প্রথম প্রান্তিকের সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিসংখ্যান

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক (দেশ এডিশন)::
প্রকাশ: ৫০ minutes ago

দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক রূপরেখা, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং এবং কাঠামোগত পরিস্থিতির নিরিখে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (মার্চ সমাপ্ত) সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, আলোচ্য প্রান্তিকে নতুন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা নেট ইকুইটি ইনফ্লোর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ ও পলিসি বিশ্লেষকেরা এই আর্থিক প্রবাহের গতিপ্রকৃতি মূল্যায়ন করে বিনিয়োগ পরিবেশের টেকসই সংস্কারের ওপর তাগিদ দিয়েছেন।

পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে যেখানে ইকুইটি বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২৬ কোটি ৩৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার, সেখানে পরবর্তীতে তা জুন, সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বর প্রান্তিকে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে। নতুন মূলধন বা ফ্রেশ ইকুইটির প্রবাহে এই পরিমিত অবস্থা সৃষ্টির পেছনে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলোর সোভরেন ক্রেডিট রেটিংয়ের অবস্থান এবং আর্থিক খাতের তারল্য ব্যবস্থাপনার প্রভাব রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

পুনঃবিনিয়োগে ইতিবাচক ধারা ও মোট এফডিআই স্টক
নতুন ইকুইটি প্রবাহের পাশাপাশি ইতিবাচক একটি চিত্র দেখা গেছে দেশে ইতিমধ্যে সক্রিয় থাকা বহুজাতিক ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর লভ্যাংশ পুনঃবিনিয়োগের (Reinvested Earnings) ক্ষেত্রে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এই পুনঃবিনিয়োগের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে ছিল মাত্র ১৯ কোটি ১২ লাখ ২০ হাজার ডলার।

নতুন ইকুইটি, পুনঃবিনিয়োগকৃত লভ্যাংশ এবং আন্তঃকোম্পানি ঋণ—এই তিনটি প্রধান উপাদান মিলিয়ে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মোট এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ১০ হাজার ডলারে। লভ্যাংশ পুনঃবিনিয়োগের এই গতিশীলতার কারণে এক বছরের ব্যবধানে মোট এফডিআইয়ের সামগ্রিক স্থিতি বা স্টক ১৮ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ২১ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য কাগুজে হিসাবের চেয়ে একদম নতুন ফ্রেশ ইকুইটি পুঁজি আকর্ষণ করা বেশি প্রয়োজন।

নীতিগত সংস্কার ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
বিনিয়োগ খাতের এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম জানান, ব্যাংকিং খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঘোষিত ১ দশমিক ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনার নীতিগত পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে চট্টগ্রামের বে টার্মিনালের মতো মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিনিয়োগের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সিস্টেমকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় করা এবং ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বা কস্ট অব ডুইং বিজনেস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হবে।

‘ইউনক্টাড ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’-এর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘানা, উগান্ডা এবং কঙ্গোর মতো আফ্রিকান দেশগুলো কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বাধ্যতামূলক সর্বনিম্ন মূলধনের শর্ত দূরীকরণ এবং একক উইন্ডো বা ওয়ান-স্টপ সেন্টারের কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ আন্তর্জাতিক পুঁজি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকেরাও কর পরিকাঠামো এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সংস্কারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের বিনিয়োগ প্রতিযোগী সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

error: Content is protected !!