
দেশের শিল্প খাতের বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি সচল রাখার স্বার্থে আধুনিক নগর পরিকল্পনা ও টেকসই পানি নিষ্কাশন পরিকাঠামো নিশ্চিত করার জোর তাগিদ দিয়েছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। সাম্প্রতিক আবহাওয়ার পরিক্রমা এবং দেশের প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক অঞ্চল ও বন্দরগুলোর কার্যক্রমে এর প্রভাব বিশ্লেষণ করে অংশীজনেরা জানিয়েছেন, দেশের উৎপাদনশীলতা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সুসংহত ও সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্পসহ অন্যান্য উৎপাদন খাতের কাঁচামাল পরিবহন ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দেওয়া সময়সীমা বজায় রাখতে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ও বন্দর পরিকাঠামো সম্পূর্ণ সচল রাখা অত্যন্ত জরুরি।
দেশের অর্থনৈতিক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকিন আহমেদ জানান, সাম্প্রতিক অতিবর্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিক্রমা দেশের কৃষি, মৎস্য, শিল্প ও পরিবহন খাতের সরবরাহ ব্যবস্থায় এক ধরনের নতুন চাপ তৈরি করেছে। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের সাথে রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভারের মতো প্রধান উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সংযোগ ব্যবস্থা মসৃণ রাখা জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তিনি মনে করেন, এই বিষয়টিকে কেবল একটি সাময়িক ঋতুভিত্তিক ঘটনা হিসেবে না দেখে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক পরিকাঠামো হিসেবে বিবেচনা করতে হবে এবং দ্রুত কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
একই সুর ব্যক্ত করে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, তৈরি পোশাক শিল্প পুরোপুরি একটি সময়নির্ভর খাত। কারখানায় যথাসময়ে কাঁচামাল পৌঁছানো এবং উৎপাদিত পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে জাহাজিকরণ নিশ্চিত করতে বন্দর এলাকায় আধুনিক ও নিরাপদ সংরক্ষণাগার বা ‘সেফ শেড’ গড়ে তোলা আবশ্যক। তৈরি পোশাক খাতের পরিবেশগত মান ও কমপ্লায়েন্স ধরে রাখতে টেকসই পানি ও রাসায়নিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেলও।
বাণিজ্যিক দিক ছাড়াও শহরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের দৈনন্দিন আয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য শ্রমঘণ্টার অপচয় রোধের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। দেশের বৃহৎ পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকল্পে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার তাগিদ এসেছে ব্যবসায়ী সমাজ থেকে।
স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও বিশিষ্ট পরিবেশবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এই সংকটের স্থায়ী ও টেকসই পরিকাঠামোগত সমাধান তুলে ধরেন। তিনি জানান, মূল সমস্যা বৃষ্টির পরিমাণ নয়, বরং আধুনিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার উপযোগিতা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শহরের প্রাকৃতিক খালসমূহ পুনরুদ্ধার, নদীগুলোর স্বাভাবিক নাব্য ও পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং প্রাকৃতিক জলাধারসমূহ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। পানি প্রবাহ বাধাহীনভাবে নদীতে যাওয়ার পথ সচল হলে শহরের পরিবেশ স্বাভাবিক হবে এবং দেশীয় শিল্পকারখানাসমূহ নির্বিঘ্নে তাদের উৎপাদন সচল রাখতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন দেশের নীতি নির্ধারকেরা।