দেশের বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বুধবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এ ঘোষণা দেন।
এর আগে গত ১৯ ও ২০ মে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির কয়েক কার্যদিবসের মধ্যেই নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করে কমিশন।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পাইকারিপর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি পেয়ে ৭ টাকা থেকে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা হয়েছে। অন্যদিকে খুচরাপর্যায়ে প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বেড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে খুচরাপর্যায়ে গড় মূল্য প্রায় ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং পাইকারিপর্যায়ে প্রায় ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একবারে এত বড় পরিসরে বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন।
আবাসিক গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ
বিইআরসির আদেশ অনুযায়ী, লাইফলাইন গ্রাহক ছাড়া আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প, কৃষি সেচ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে।
আবাসিক গ্রাহকদের বিভিন্ন ধাপে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ০-৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি মূল্য ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা হয়েছে। অন্যদিকে ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিটপ্রতি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা।
শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা
বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতেও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে। নিম্নচাপ, মধ্যমচাপ ও উচ্চচাপ সংযোগভিত্তিক গ্রাহকদের জন্য পিক আওয়ার, অফ-পিক আওয়ার এবং ফ্ল্যাট রেট—সব ক্ষেত্রেই নতুন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ করে সান্ধ্যকালীন পিক আওয়ারে বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এছাড়া কৃষি সেচ, বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি চার্জিং, রাস্তার বাতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও নতুন মূল্যহার কার্যকর হবে।
অর্থনীতিতে প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ
অর্থনীতিবিদ ও গবেষকরা বলছেন, বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় এবং সেবার খরচ বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিস)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীর বলেন, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ থাকলেও মূল্য সমন্বয়ের মাত্রা সহনীয় পর্যায়ে রাখলে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপ তুলনামূলক কম পড়ত।
তিনি বলেন, বিদ্যুতের মূল্য পরিবর্তনের প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পণ্য ও সেবার ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ভোক্তা ও শিল্পমালিকদের প্রতিক্রিয়া
রাজধানীর মিরপুরের বাসিন্দা জীবন আহসান বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে আগে থেকেই ব্যয় বেড়েছে। নতুন বিদ্যুৎ মূল্যহার কার্যকর হলে পরিবার পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শিল্পখাতের প্রতিনিধিরাও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে আনছেন। বিকেএমইএ সভাপতি হাতেম আলী বলেন, বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় শিল্পকারখানার পরিচালন খরচ বাড়াতে পারে। এতে রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে ভোক্তা অধিকারকর্মীরাও নতুন মূল্যহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশীজনদের মতামত ও ব্যয় পর্যালোচনার বিষয়গুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিইআরসির অবস্থান
সংবাদ সম্মেলনে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, বিদ্যমান আর্থিক ও পরিচালনাগত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, মূল্য সমন্বয়ের পরও বিদ্যুৎ খাতে সরকারের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভর্তুকি অব্যাহত থাকবে।
অন্যদিকে গণশুনানিতে অংশ নেওয়া বিভিন্ন ভোক্তা সংগঠন, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মূল্য বৃদ্ধির বিষয়ে আপত্তি জানান। তাদের মতে, নতুন মূল্যহার বিভিন্ন খাতে পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি করতে পারে এবং এর প্রভাব পণ্য ও সেবার ব্যয়ের ওপরও পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকরের পর এর প্রকৃত প্রভাব বাজার, শিল্পখাত ও সাধারণ ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপর কতটা পড়ে, তা আগামী কয়েক মাসে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
বিইআরসির প্রকাশিত আদেশ অনুযায়ী, নতুন মূল্যহার নির্ধারিত সময় থেকে কার্যকর হবে।