
১১ কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া আরও জোরদার হয়েছে। আজ বুধবার (১ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে সাবেক এই শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আরও ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কর্মকর্তা ও সাব-রেজিস্ট্রার উপস্থিত হয়ে প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য প্রদান করেছেন।
দুদকের প্যানেল প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, নতুন এই ছয়জনের সাক্ষ্য গ্রহণের মাধ্যমে তিন কার্যদিবসে মামলাটির মোট ২৮ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৪ জনের জবানবন্দি ও জেরা সম্পন্ন হলো। আদালত মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য আগামী ১৬ জুলাই দিন ধার্য করেছেন।
আজ বুধবার আদালতে উপস্থিত হয়ে বেনজীর আহমেদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের দলিলের সপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন— নারায়ণগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার আব্দুল হাফিজ, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার এস এম মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁর মহাদেবপুরের সাব-রেজিস্ট্রার রফিকুল ইসলাম, ভোলার চরফ্যাশনের সাব-রেজিস্ট্রার কাওসার খান, ঢাকার বাড্ডার সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম এবং বন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আব্দুস সালাম। এর আগে গত ৩ মে বিজ্ঞ আদালত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের (চার্জশিট গঠন) মাধ্যমে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে নিয়মিত বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন।
নথি অনুযায়ী, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর এই অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাটি দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বেনজীর আহমেদ তাঁর দাখিলকৃত প্রাথমিক সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে দুদকের গভীর তদন্তে তাঁর নামে প্রকৃতপক্ষে ৭ কোটি fifty-two লাখ ৬৮ হাজার টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ হাজার টাকার অস্থাবর সম্পদসহ মোট ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকার অঢেল সম্পদের অকাট্য প্রমাণ মেলে। তাঁর সমস্ত বৈধ আয়ের উৎস বিশ্লেষণ করে নিট সঞ্চয় বাদ দেওয়ার পর দেখা যায়, সাবেক এই আইজিপি সম্পূর্ণ জ্ঞাত আয়বহির্ভূতভাবে ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন।
চলতি অবৈধ সম্পদের মামলাটি ছাড়াও বেনজীর আহমেদ ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে আরও পাঁচটি মামলা দায়ের করেছে দুদক, যা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর সরকারি চাকরিতে বহাল থেকেও তথ্য গোপন করে নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী দেখিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগে বেনজীরসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে প্রথম মামলাটি করা হয়।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বেনজীর আহমেদ, তাঁর স্ত্রী জীশান মির্জা, দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় মামলা করে দুদক। এছাড়া ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে বেনজীরের স্ত্রী ও দুই মেয়ের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা করা হয়, যেখানে বেনজীর আহমেদকে অপরাধের সহযোগী আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। আদালতের আগামী তারিখগুলোতে বাকি সাক্ষীদের জেরা সম্পন্ন করা হবে।