
বিশ্ব রাজনীতি আজ আর কেবল ঐতিহ্যগত কূটনৈতিক সম্পর্কের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বর্তমান যুগে অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং ভূরাজনীতির জটিল ও বহুমুখী সমীকরণে রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হচ্ছে। এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের চীন ও মালয়েশিয়া সফর নিছক দুটি সাধারণ দ্বিপাক্ষিক সফর নয়; বরং তা দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
বাংলাদেশ বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার সাময়িক সংকট, অভ্যন্তরীণ বাজারগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ এবং বৈশ্বিক নানাবিধ অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগিতা সুনিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সাম্প্রতিক চীন সফরে প্রত্যাশিত বিপুল পরিমাণ সরাসরি নগদ সহায়তা দৃশ্যমান না হলেও, বড় অঙ্কের অনুদান, স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের যুগান্তকারী উদ্যোগ এবং বিভিন্ন মেগা উন্নয়ন প্রকল্পে সহযোগিতার জোরালো প্রতিশ্রুতি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক (MoU) আর বাস্তবে রূপান্তরিত চুক্তি কখনোই এক বিষয় নয়। এই সফরের প্রকৃত সাফল্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে গৃহীতো পদক্ষেপগুলোর দ্রুত ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
চীনের সাথে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও উচ্চতর কৌশলগত অংশীদারিত্বে উন্নীত করা বাংলাদেশের জন্য যেমন নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগের সৃষ্টি করেছে, তেমনি এর সাথে কিছু নতুন আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতাও তৈরি করেছে। দেশের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনে যেকোনো বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের কাছ থেকে সহযোগিতা গ্রহণ অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সেই আর্থিক বা কারিগরি সহযোগিতা যেন কোনোভাবেই দেশের কৌশলগত স্বাধীনতা কিংবা দীর্ঘদিনের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্যকে বিশ্ব দরবারে প্রশ্নবিদ্ধ না করে, সে বিষয়েও সমানভাবে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।
আমাদের আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এই জটিল বাস্তবতারই একটি স্পষ্ট ও বড় উদাহরণ। এটি কেবলই একটি নদীর পানি বা টেকসই পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সাধারণ প্রকল্প নয়; বরং এটি বর্তমান আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারত ও চীনের প্রতিযোগিতার এক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক ইস্যু। ফলে এই প্রকল্পে বাংলাদেশের প্রতিটি পদক্ষেপকে অত্যন্ত বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা ও সতর্কতার সাথে বিবেচনা করতে হবে, যাতে আমাদের উন্নয়নের প্রয়োজনে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আঞ্চলিক রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়া সফরের গুরুত্ব বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও প্রবাসী কল্যাণের অন্যতম বড় উৎস এই শ্রমবাজার। সেখানে যদি পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, সিন্ডিকেটমুক্ত উপায়ে কর্মী নিয়োগ সম্ভব হয় এবং বাংলাদেশি কর্মীদের আইনি অধিকার পুরোপুরি সুনিশ্চিত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তবে তা দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সাথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের (ASEAN) সাথে সম্পর্ক আরও জোরদার করার সুযোগও বাংলাদেশের জন্য নতুন বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে এসব অর্জন ও সম্ভাবনার মধ্যেও সবচেয়ে বড় ও কঠিন বাস্তবতা হলো—বাংলাদেশকে এখন একই সাথে বিশ্ব রাজনীতির প্রধান চার শক্তি চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে এক নিখুঁত ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে। একদিকে চীন যেমন আমাদের বড় অবকাঠামো ও বিনিয়োগের অন্যতম বড় অংশীদার, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ হলো বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যের মূল বাজার, আর ভারত হলো আমাদের নিকটতম ভৌগোলিক প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। তাই কোনো একটি বিশেষ শক্তির প্রতি অতিমাত্রায় ঝুঁকে পড়া বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হবে না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ও ঐতিহাসিক ভিত্তিই ছিল—‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ বর্তমানের এই পরিবর্তিত ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ বৈশ্বিক বাস্তবতায় এই কালজয়ী নীতির প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজনীয়তা আগের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে গেছে। দেশের অগ্রগতির জন্য আমাদের বহুমুখী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গ্রহণ করতে হবে ঠিকই, কিন্তু সেই সহযোগিতার বিনিময়ে আমাদের নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
পরিশেষে বলা যায়, চীন ও মালয়েশিয়া সফরের প্রকৃত ও চূড়ান্ত মূল্যায়ন হবে কেবল যৌথ ঘোষণাপত্রে নয়, বরং মাঠপর্যায়ে তার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুবর্ণ সুযোগগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগিয়ে, পরাশক্তিদের পারস্পরিক প্রতিযোগিতা থেকে নিরাপদ ও নিরেট দূরত্ব বজায় রেখে এবং সর্বদা জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রজ্ঞার সাথে এগিয়ে যেতে পারলেই বাংলাদেশ উন্নয়নের সন্ধানে যেমন সফল হবে, তেমনি ভূরাজনীতির এই জটিল চৌরাস্তায়ও নিজের মর্যাদাপূর্ণ ও স্বাধীন অবস্থান অটুট রাখতে সক্ষম হবে।