স্বাস্থ্য-শিক্ষায় নতুন দিগন্তের সম্ভাবনা বাজেটে

অর্থনীতি প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে রোগপ্রতিরোধ কেন্দ্রিক করে গড়ে তুলতে এবং সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এবার স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো ও শিক্ষার আমূল পরিবর্তন করতে সর্বমোট ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের বছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে কেবল হাসপাতাল-ভিত্তিক চিকিৎসা দিয়ে সবার স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এই কারণে সরকার প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বা রেফারেল কার্ড ছাড়া কেউ সরাসরি বিশেষায়িত বা টারশিয়ারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন না।

মাঠপর্যায়ে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যসেবাকে প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিশাল কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশই হবেন নারী। এর পাশাপাশি জরুরি ভিত্তিতে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক এবং ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হবে। দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে, যা হাসপাতালের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমাবে। একই সাথে নাগরিকদের জন্য ডিজিটাল ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর মাধ্যমে ন্যাশনাল হেলথ সিস্টেম গড়ে তোলা হবে।

ওষুধ ও বিশেষায়িত চিকিৎসার খরচ কমছে
সীমিত আয়ের মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা কমাতে বাজেটে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে বড় ধরনের শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে। ওষুধশিল্পের নতুন ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল এবং অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে, যার ফলে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসবে।

এ ছাড়া হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারে ব্যবহৃত রিং বা স্টেন্টের দাম কমানোর পাশাপাশি কিডনি রোগীদের হেমোডায়ালাইসিস সামগ্রীর ওপর থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাটের আগাম কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য এককালীন সরকারি অনুদান ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও পর্যবেক্ষণ সেল
বাজেট বরাদ্দের সঠিক বণ্টন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ সেল গঠন করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক এই বিশাল বরাদ্দকে ইতিবাচক আখ্যা দিয়ে বলেন, “প্রথম মাস থেকেই খরচ ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে তদারকি করতে হবে, অন্যথায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলো চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, “কমিউনিটি পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করতে হবে। তবে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে একটি স্বাধীন স্বাস্থ্য কমিশন গঠন এবং তৃণমূলের ওষুধ বিক্রেতাদের সঠিক প্রশিক্ষণের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।”

error: Content is protected !!