২০২৪ সালের ছাত্র জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান

বিশেষ প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ১ ঘন্টা আগে

ইতিহাসের পাতা উল্টালে কিছু কিছু সময় আসে যখন সাধারণ মানুষ ইতিহাস তৈরি করে। ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাস ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের ঠিক তেমনই এক রক্তক্ষরা অথচ গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কোনো অস্ত্র ছাড়াই, কেবল বুকে অদম্য সাহস আর চোখে এক বৈষম্যহীন নতুন দেশের স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার লাখো ছাত্র-জনতা। আর সেই স্বপ্নের মূল্য দিতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে গেছে হাজারো তরতাজা প্রাণ। আজ দুই বছর পরও সেইসব নাম না জানা বীর শহীদদের স্মৃতি আর আত্মত্যাগ বাংলাদেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে গভীর আবেগ ও পরম সম্মানের সাথে দোলা দেয়।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করে বুক পেতে দেওয়ার সেই দৃশ্য কিংবা ঢাকার উত্তরায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর “পানি লাগবে কারো, পানি?”— বলতে বলতে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা শুধু দুটি নাম নয়, এগুলো হয়ে উঠেছে এ দেশের তরুণ সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে চিরন্তন প্রতিরোধের প্রতীক।

২০২৪ সালের সেই উত্তাল দিনগুলোতে আন্দোলন কেবল কোটা সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তা রূপ নিয়েছিল রাষ্ট্র সংস্কার এবং মানুষের নাগরিক অধিকার আদায়ের এক সর্বজনীন গণ-অভ্যুত্থানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজের কিশোর, দিনমজুর, রিকশাচালক ও সাধারণ মায়েরা পর্যন্ত শামিল হয়েছিলেন এই স্বাধিকারের লড়াইয়ে। যখন চারপাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বুলেট ধেয়ে আসছিল, তখনো এই দেশের তরুণেরা পিছু হঠেনি। মাতৃভূমির মুক্তির জন্য, একটি সুন্দর আগামী গড়ার জন্য তারা নিজেদের সোনালী ভবিষ্যৎ আর অমূল্য জীবনকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি।

হাসপাতালের বারান্দায় স্বজনদের আহাজারি, সন্তানহারা মায়ের শূন্য বুক, আর পঙ্গুত্ব বরণ করা শত শত তরুণের আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল বাংলার আকাশ-বাতাস। একেকটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার গল্প যেমন বুকটা ভেঙে দেয়, ঠিক তেমনি তাঁদের এই অভূতপূর্ব বীরত্ব পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে গেছে এক অন্তহীন অনুপ্রেরণা।

একটি গণতান্ত্রিক, সাম্য ও মানবিক মর্যাদাসম্পন্ন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে পবিত্র আমানত শহীদরা আমাদের হাতে সঁপে দিয়ে গেছেন, তার গুরুত্ব আজ অপরিসীম। দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৪ সালের এই ছাত্র-জনতার আন্দোলন প্রমাণ করেছে যে, এই দেশের মানুষ অন্যায় ও স্বৈরাচারের কাছে কখনো মাথা নত করে না। শহীদদের এই আত্মত্যাগ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তাঁদের স্বপ্নের সেই শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

সবশেষে বলা যায়, ২০২৪ সালের শহীদদের রক্ত কেবল লাল রঙের কোনো দাগ নয়; এটি একটি নতুন সূর্যোদয়ের ইশতেহার। তাঁরা জীবনের বিনিময়ে আমাদের যে বাকস্বাধীনতা ও নতুন দেশ উপহার দিয়েছেন, সেই রক্তের ঋণ শোধ করা কখনোই সম্ভব নয়। বীর শহীদদের প্রতি দেশবাসীর এই গভীর আবেগ আর বিনম্র শ্রদ্ধা আজীবন অক্ষয় হয়ে থাকবে ইতিহাসের সোনালী অক্ষরে। বাংলার প্রতিটি ধূলিকণায় তাঁরা বেঁচে থাকবেন চিরকাল।

error: Content is protected !!