চট্টগ্রাম নিলামেই মিলছে চায়ের সর্বোচ্চ দাম

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক (দেশ এডিশন):
প্রকাশ: ৫৫ minutes ago

দেশে নিলামে বিক্রি হওয়া চায়ের বাজার সম্প্রসারণ এবং উৎপাদকদের দীর্ঘসূত্রতা এড়ানোর লক্ষ্যে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে নতুন দুটি নিলাম কেন্দ্র চালু করা হলেও তা এখনো ক্রেতা-বিক্রেতাদের আকর্ষণ করতে পারেনি। বাংলাদেশ চা বোর্ডের সূত্র অনুযায়ী, দেশে নিলামে বিক্রি হওয়া চায়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ লেনদেনই এককভাবে সম্পন্ন হয় ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম নিলাম কেন্দ্রে। বাকি মাত্র ৩ শতাংশের মতো চা বিক্রি হচ্ছে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ের নতুন দুটি কেন্দ্রে।

চা উৎপাদনের সিংহভাগ বাগান ও কারখানা এই অঞ্চলগুলোতে থাকলেও, বড় ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি, ব্যবসায়ীদের আনাগোনা কম থাকা এবং নিলামের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাবে নতুন কেন্দ্র দুটি কার্যত কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না। বর্তমানে স্থানীয় ছোট ক্রেতাদের ওপর নির্ভর করেই কোনো রকমে এই দুটি কেন্দ্র সচল রাখা হয়েছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে দেশের তিনটি নিলাম কেন্দ্রে মোট ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে মোট বিক্রি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৮৫ শতাংশ বা ২৪ লাখ ৩০ হাজার কেজি চা। বাকি ৮ কোটি ৫৩ লাখ কেজি চা এককভাবে বিক্রি হয়েছে চট্টগ্রামে।

পরবর্তী ২০২৫-২৬ নিলামবর্ষে মোট ৯ কোটি ৬ লাখ ৬০ হাজার কেজি চা বিক্রি হয়, যার মধ্যে মাত্র ২৯ লাখ ৪০ হাজার কেজি বা ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ চা বিক্রি হয়েছে শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে। বাকি ৮ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার কেজি চা এককভাবে চট্টগ্রাম কেন্দ্রে লেনদেন হয়।

চলতি ২০编制৬-২৭ মৌসুমের নিলামবর্ষেও অন্য দুটি কেন্দ্রে চা বিপণনের এই নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। গত ১-২৯ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামের ৫টি নিলামে ১ কোটি ১৬ লাখ ৭ হাজার কেজি চা গড়ে ২৬৯ টাকা ১৪ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। অন্যদিকে, ২০ মে থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলের ৫টি নিলামে মাত্র ১ লাখ ৮৯ হাজার কেজি চা গড়ে ২৫২ টাকা ৫ পয়সায় এবং ২৮ এপ্রিল থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত পঞ্চগড়ের ৫টি নিলামে ১ লাখ ৩৭ হাজার কেজি চা গড়ে ২৩৭ টাকা ৫৯ পয়সায় লেনদেন হয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ২৯ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম কেন্দ্রে নয়টি নিলামে প্রতি কেজি গড়ে ২৭২ টাকা ১০ পয়সায় ১ কোটি ৭৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩২৮ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। বিপরীতে শ্রীমঙ্গলে আটটি নিলামে প্রতি কেজি গড়ে ২৫৩ টাকা ৯১ পয়সায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৫ কেজি এবং পঞ্চগড়ে পাঁচটি নিলামে প্রতি কেজি গড়ে ২৩৪ টাকা ৯৩ পয়সায় ১ লাখ ৩৭ লাখ ১৩৫ কেজি চা বিক্রি হয়েছে। দামের এই পার্থক্যের কারণে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম কেন্দ্রে চা পাঠানোর প্রবণতা অনেক বেশি।

চা-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চায়ের উৎপাদন এলাকা হলেও এখনো শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে কৃষিজ পণ্য যথাযথ সংরক্ষণে পর্যাপ্ত ওয়্যারহাউজ নির্মিত হয়নি। এছাড়া অর্থ লেনদেনের সংকট এবং সিংহভাগ বৃহৎ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ঢাকা ও চট্টগ্রামে হওয়ায় কর্মকর্তারা শ্রীমঙ্গলের মতো দূরবর্তী এলাকায় গিয়ে চা কেনাকে সুবিধাজনক মনে করছেন না।

অথচ দেশের উৎপাদনে এই অঞ্চলগুলোর অবদান অনেক। ২০২৫ সালের তথ্যমতে, দেশে উৎপাদিত ৯ কোটি ৪৯ লাখ socio-অর্থনৈতিক ৩০ হাজার কেজি চায়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ (৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার কেজি) উৎপাদন হয়েছে মৌলভীবাজারে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে পঞ্চগড়ে। এছাড়া হবিগঞ্জে ১৬%, চট্টগ্রামে ১১% ও সিলেটে ৪% চা উৎপাদিত হয়। দাবির মুখে ২০১৮ সালের ১৪ মে শ্রীমঙ্গলে দেশের দ্বিতীয় এবং ২০২৩ সালের ৪ অক্টোবর পঞ্চগড়ে দেশের তৃতীয় (প্রথম অনলাইননির্ভর) নিলাম কেন্দ্র চালু করা হয়।

বাংলাদেশ চা বোর্ডের সদস্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ মোয়াজ্জম হোসাইন বলেন, ‘স্থানীয় মানুষের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকার শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে নিলাম কেন্দ্র চালু করেছে। কিন্তু এসব কেন্দ্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিয়ে আসার মূল দায়িত্ব বেসরকারি উদ্যোক্তাদের। ধারাবাহিকভাবে অবকাঠামো নির্মাণসহ চাহিদা অনুযায়ী মানসম্মত চা প্রতিযোগিতামূলক দামে সরবরাহের নিশ্চয়তা দেওয়া গেলে ধীরে হলেও নতুন নিলাম বাজারগুলো জনপ্রিয় হবে।’ তবে এখন পর্যন্ত নতুন কেন্দ্র দুটির লেনদেন ২-৩ শতাংশের ঘরে আটকে থাকা হতাশাজনক বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যান্ড টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবিএম আখতারুজ্জামান বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে দ্রুত উৎপাদন বৃদ্ধির জেলা হিসেবে পঞ্চগড় চা শিল্পে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছে। নিলাম কেন্দ্র চালু হলেও এখনো বড় ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়নি।’ তবে সরকারের নীতিসহায়তার পাশাপাশি অনলাইনভিত্তিক এই নিলাম বাজারকে জনপ্রিয় করা গেলে পঞ্চগড় ভবিষ্যতে একটি আকর্ষণীয় নিলাম কেন্দ্রে পরিণত হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

উল্লেখ্য, চলতি মৌসুমে (এপ্রিল-মার্চ) চা বোর্ডের সমন্বয় কমিটি অনুযায়ী চট্টগ্রামে ৪৭টি (প্রতি সোমবার), শ্রীমঙ্গলে ৪৭টি (প্রতি বুধবার) এবং পঞ্চগড়ে ২৫টি (প্রতি মাসে দুবার, মঙ্গলবার) নিলাম অনুষ্ঠিত হবে।

error: Content is protected !!