নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট সচেতনতা

অলিউল্লাহ কায়সার:
প্রকাশ: ৬ minutes ago

আধুনিক নাগরিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভাবনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে খাদ্য উপাদানের গুণগত মান। এত দিন সাধারণ ফসলের স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা থাকলেও বর্তমানে তার সাথে যোগ হয়েছে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত বালাইনাশকের অতিরিক্ত প্রয়োগ ও গুণগত মানহীন উপাদানের ব্যবহার। বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন এই প্রবণতা ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়ছে, যা আমাদের দীর্ঘমেয়াদী খাদ্য নিরাপত্তা এবং মাটির স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে। অথচ একটি চিরন্তন সত্য আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে—যেকোনো ধরনের কৃষি রাসায়নিকের নিয়মতান্ত্রিক ও পরিমিত ব্যবহার হলো ফসলের জন্য ওষুধ, আর এর অনিয়ন্ত্রিত বা অপরিকল্পিত ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্যকে ব্যাহত করতে পারে।

মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান মৌলিক উপাদান হলো খাদ্য, যা আমাদের পুষ্টিসাধন ও শারীরিক শক্তি জোগায়। কিন্তু প্রাত্যহিক পুষ্টির জন্য আমরা যেসব ফসল গ্রহণ করছি, তার স্বাস্থ্যগত মান নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনার অবকাশ রয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদনে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশক ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনের সময় বড় একটি অংশে বালাইনাশক এবং ফসল সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের সময় বাকি অংশে বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। ধান ও শাকসবজি আকর্ষণীয় করতে কিছু ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম কার্বাইড বা ইথেফোনের মতো উপাদানের ব্যবহার সাধারণ ভোক্তাদের সচেতনতাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ অতীতে আমাদের গ্রামীণ কৃষিতে গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা, লতাপাতা ও রান্নাঘরের আবর্জনা পচিয়ে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক জৈব সার তৈরি করা হতো, যা মাটির উর্বরতা রক্ষা করে পুষ্টিকর ফসল উৎপাদনে ভূমিকা রাখত।

বালাইনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের পাশাপাশি বর্তমান সময়ে অনেক চাষি বিভিন্ন ধরনের কৃষি রাসায়নিকের নিজস্ব মিশ্রণ তৈরি করছেন, যা মাঠপর্যায়ে ‘ককটেল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। কৃষকরা অনেক সময় বালাইনাশক বিক্রেতাদের সাধারণ পরামর্শে কীটনাশক, ছত্রাকনাশক ও হরমোন (ভিটামিন) একত্রে মিশিয়ে জমিতে স্প্রে করেন। বৈজ্ঞানিকভাবে এই উপাদানগুলোর প্রতিটিই আলাদা আলাদা রাসায়নিক, যা একত্রে মিশ্রিত হয়ে নতুন যৌগ তৈরি করে এবং ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সঠিক সুরক্ষাসামগ্রী ছাড়া এই ধরণের মিশ্রণ ব্যবহারের কারণে দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ চাষি বিভিন্ন ধরণের শারীরিক অস্বস্তি, যেমন—চোখ ও ত্বকের সংবেদনশীলতা কিংবা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগে থাকেন।

আমাদের দেশের চাষিরা সাধারণত অনুকরণপ্রিয় হওয়ায় অন্যের দেখাদেখি নতুন চাষপদ্ধতি গ্রহণ করেন। এই সরলতাকে পুঁজি করে অনেক সময় লাইসেন্সবিহীন বা অপ্রাতিষ্ঠানিক বিক্রেতারা সঠিক রোগ শনাক্ত না করেই একাধিক রাসায়নিক একত্রে ব্যবহারের পুশ-সেল বা পরামর্শ দেন। উদাহরণস্বরূপ, ঈশ্বরদীর একজন অভিজ্ঞ কৃষক আমজাদ হোসেন (ছদ্মনাম) দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করছেন। সম্প্রতি তাঁর সবজিখেতে পাতা কোঁকড়ানো লক্ষণ দেখে স্থানীয় একজন বিক্রেতার পরামর্শে তিনি পর্যায়ক্রমে সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেন, কিন্তু আশানুরূপ সুফল পাননি। তাঁর মতো অনেক চাষিই প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানহীন বালাইনাশক ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয়ের দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, যা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট তদারকি প্রয়োজন।

অপরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিকভাবে মাটি, বায়ু ও পানির স্বাভাবিক উপাদানসমূহের মধ্যে পরিবর্তন আসছে। এর ফলে মাটির অভ্যন্তরের উপকারী অণুজীবের কার্যাবলি ধীর হয়ে পড়ছে এবং কেঁচো, ব্যাঙ বা জলজ প্রাণীর প্রাকৃতিক বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।

বালাইনাশকের বিষক্রিয়ার স্থায়িত্ব সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকার কারণে অনেক সময় শাকসবজিতে স্প্রে করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তা বাজারে সরবরাহ করা হয়। এর ফলে ফসলের গায়ে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ বা ‘রেসিডিউ’ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা সাধারণ ভোক্তাদের প্রাত্যহিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি বড় নিয়ামক। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বালাইনাশকের বাজার প্রায় ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার, যার সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। প্রতিবছর প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন বালাইনাশক আমদানির জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ অনুমোদিত কোম্পানি কাজ করছে। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ভারসাম্য রক্ষার্থে এই বিশাল পরিমাণ রাসায়নিকের আমদানি ও ব্যবহার একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আনা জরুরি।

জৈব কৃষির প্রতি মনোযোগ বাড়িয়ে এবং রাসায়নিকের ওপর অতি-নির্ভরতা কমিয়ে কীভাবে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, সেটিই এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। ফসলে অপ্রয়োজনীয় বালাইনাশক ব্যবহার প্রতিরোধে বাংলাদেশে বেশ কিছু কার্যকর আইনি কাঠামো ও নীতিমালা রয়েছে। এর মধ্যে দণ্ডবিধি ১৮৬০, বিশুদ্ধ খাদ্য আইন ২০০৫, ভ্রাম্যমাণ আদালত অধ্যাদেশ ২০০৯ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এমনকি বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪-এর অধীনেও খাদ্যের সুরক্ষা বজায় রাখতে কঠোর শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। এই বিদ্যমান আইনগুলোর যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বাজারে মানহীন বালাইনাশক সরবরাহ অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

একই সাথে, কৃষকদের ডিলার বা অপ্রাতিষ্ঠানিক বিক্রেতাদের ব্যক্তিগত পরামর্শের ওপর নির্ভর না করে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের (উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা) সরাসরি বৈজ্ঞানিক পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। ফসলের রোগ বা পোকার আক্রমণ সঠিকভাবে নিশ্চিত হয়ে শুধুমাত্র সরকার অনুমোদিত নির্দিষ্ট বালাইনাশক পরিমিত মাত্রায় প্রয়োগের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তৃণমূল স্তরে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও সেমিনার আয়োজন করার মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশের কৃষিকে একটি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও আন্তর্জাতিক মানের টেকসই শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।

error: Content is protected !!